ডেস্ক রিপোর্ট: অদ্ভুত এক নিয়তি! ঠিক ৮০ বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬ জুন এক শুভ বুধবারে যে জীবন-প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, দীর্ঘ আট দশকের বর্ণাঢ্য কর্মময় পথচলা শেষে সেই একই সংখ্যার মায়াজালে ঘেরা ৬ মে (বুধবার) তিনি পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে। জন্ম আর বিদায়ের এই ললাটলিখন যেন মিলে গেল এক গাণিতিক সমীকরণে। মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়টুকু কেবল সংখ্যা বা ক্যালেন্ডারের পাতা নয়; বরং সততা, নিরন্তর সংগ্রাম, শিক্ষা ও পাহাড়সম আত্মমর্যাদার এক অবিনাশী মহাকাব্য।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরসহ উত্তর জনপদে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘তোতা মাস্টার’ ও পরে ‘তোতা উকিল’ নামে। তিনি কেবল একজন মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক বিশাল বটবৃক্ষ—দক্ষিণ জামুডাঙ্গা গ্রামের অন্ধকার তাড়ানো এক আলোকবর্তিকা। গত ৬ মে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে তাঁর মহাপ্রয়াণে একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ হারালো এক নীতিনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবককে।
তোতা উকিলের আদর্শের একমাত্র উত্তরাধিকার সাংবাদিক ছেলে জিল্লুর রহমান পলাশ বাবার কর্মময় জীবনের চিত্র নিয়ে লিখেছেন—
মণ্ডল বংশের উত্তরাধিকার ও স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই:
১৯৪৫ সালের ৬ জুন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দক্ষিণ জামুডাঙ্গা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মণ্ডল পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির জীবন ছিল সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও নীতির এক অনন্য গল্প। সীমিত সামর্থ্য, কঠিন বাস্তবতা আর জীবনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষা, পরিশ্রম ও সততার শক্তিতে।

মরহুম জহুরুল ইসলাম মণ্ডল ছিলেন ঐতিহ্যবাহী মণ্ডল বংশের উত্তরসূরী। তাঁর পিতা আব্দুল গফুর মণ্ডল ছিলেন শত বিঘা জমির মালিক। আভিজাত্য ও সচ্ছলতার মাঝে বড় হলেও জহুরুল ইসলামের পড়াশোনার পথ সহজ ছিল না। তৎকালীন পারিবারিক সীমাবদ্ধতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তিনি কিশামত বড়বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পায়ে হেঁটে এবং পরে বাইসাইকেলে মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক অর্জনের সময় তিনি নিজ বাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থেকেছেন, যা তাঁর হার না মানা মানসিকতা ও স্বাবলম্বী হওয়ার প্রবল ইচ্ছারই প্রতিফলন এবং আত্মনির্ভরশীল চরিত্রের এক অনন্য দলিল।
তোতা মাস্টার’: শিক্ষার কারিগর ও সমাজ সংস্কারক:
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতাকে সমাজ পরিবর্তনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শিক্ষিত জাতিই পারে অন্ধকার সমাজকে আলোকিত করতে। সেই চেতনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন *নিয়ামতনগর উচ্চ বিদ্যালয়* এবং পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন *দক্ষিণ জামুডাঙ্গা আদর্শ দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসা*। আজ তাঁর হাতে গড়া এই বিদ্যাপীঠগুলো হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন সারথি হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা ছড়াচ্ছে।
স্বপ্ন ও রূপান্তর: ন্যায়ের যোদ্ধা ‘তোতা উকিল’:
শিক্ষকতার সফল অধ্যায় শেষে শ্বশুরের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ এবং আইনের মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবা করার লক্ষে তিনি জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। বয়সের বাধাকে তোয়াক্কা না করে ১৯৯১-৯২ সালে এলএলবি সম্পন্ন করে ১৯৯৩ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। শিক্ষক থেকে তিনি রূপান্তরিত হন ‘তোতা উকিল’-এ। গাইবান্ধা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে আদালত পাড়ায় তিনি ছিলেন এক প্রখর ধীসম্পন্ন ও স্পষ্টভাষী ন্যায়যোদ্ধা। তাঁর কাছে বিত্তবান আর নিঃস্ব মানুষের কোনো প্রভেদ ছিল না; বিচারপ্রার্থীর অধিকার রক্ষায় তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বিচারিক অঙ্গনে পরম শ্রদ্ধা কুড়িয়েছিল।

মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ও গ্রামীণ স্থপতি:
ব্যক্তিত্বে হিমালয় সদৃশ হলেও জীবনযাপনে তিনি ছিলেন মাটির মানুষ। ব্যবসা ও কৃষিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য পাওয়া এই মানুষটি জনসেবার তীব্র নেশায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনবার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। জনপ্রতিনিধি না হয়েও এলাকার উন্নয়নে তিনি নিবেদিত ছিলেন। গ্রামের কাদামাখা পথে মানুষের চলাচলের কষ্ট দূর করতে তিনি নিজেই কোদাল হাতে তুলে নিয়েছেন, রাস্তা বড় করেছেন। জামুডাঙ্গা গ্রামের ঘাঘট নদীর পাড়ে খেয়া ঘাট নির্মাণে তাঁর সেই ব্যক্তিগত শ্রম ও ঘাম আজও প্রতিটি ধূলিকণায় স্মৃতির সুবাস ছড়াচ্ছে।
লজিং মাস্টারি থেকে দাম্পত্য জীবনের শুরু:
কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি জামালপুর ইউনিয়নের তৎকালীন টানা তিনবারের চেয়ারম্যান মরহুম আবুল হোসেন সরকারের বাড়িতে লজিং মাস্টার ছিলেন। দেশ স্বাধীনের আগে শখ করে আবুল চেয়ারম্যান তাঁর বড় মেয়ে খোদেজা বেগমের সঙ্গে জহুরুল ইসলামকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন। গরু গাড়িতে বরযাত্রী যাওয়ার সেই প্রথা মেনে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর সঙ্গে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের সেই দাম্পত্য জীবনের শুরু, যা আজ একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ অসুস্থতা ও ইস্পাতকঠিন আত্মিক দৃঢ়তা:
জীবনের শেষ ভাগে অ্যাজমা, হৃদরোগ ও কিডনিজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হলেও তিনি মানসিকভাবে ছিলেন অটল। ২০১৯ সালে করোনাকালের শুরুতে গুরুতর অসুস্থ থাকাবস্থায় তাঁর যে প্রবল মানসিক শক্তি দেখা গিয়েছিল, তা চিকিৎসকদেরও বিস্ময়াভিভূত করেছিল। শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পরও মাঝে মাঝে ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে আদালতে যেতেন নিজের সেই চেনা বিচারিক চেয়ারটিতে ক্ষণিকের জন্য বসতে। বস্তুত ওষুধের চেয়ে তাঁর আত্মমর্যাদা আর অদম্য জীবনবোধই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার মূল সঞ্জীবনী শক্তি।
পরিবার ও সফল উত্তরসূরী:
জহুরুল ইসলাম মণ্ডল তোতা মিয়া ও খোদেজা বেগমের দীর্ঘ দাম্পত্য সংসারে রেখে গেছেন একমাত্র ছেলে সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ এবং ৫ কন্যা—জুঁই, জেলি, পলি, পপি ও লিপি। সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে যোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বর্তমানে নাতি-পুতিসহ তাঁর পরিবারটি এলাকায় একটি আদর্শ ও বৃহৎ পরিবার হিসেবে সুপরিচিত।

আদর্শের উত্তরাধিকার: বাবার প্রেরণায় সাংবাদিক ছেলে:
একমাত্র ছেলে হিসেবে আমি বাবার প্রতিটি পদক্ষেপ খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর ইচ্ছা ছিল আমিও যেন আইন পেশায় থিতু হই। তাঁর প্রতি সম্মান রেখে ২০১৩ সালে এলএলবি শেষ করলেও বাবার সেই সাহসী রক্তই আমাকে টেনে নিয়ে গেছে সংবাদ জগতের সত্য প্রকাশের নেশায়। ২০১৭ সালে বাবার পাশে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে বসার দিনগুলোতে তাঁর ব্যক্তিত্ব আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত। আজ আমি সাংবাদিক হিসেবে যে নৈতিকতার কথা বলি, তার মূল শিক্ষা পেয়েছিলাম বাবার সেই সাধারণ কিন্তু উন্নত জীবনদর্শন থেকে।
মৃত্যুর আগে নিজেই গড়েছিলেন শেষ ঠিকানা:
পরকালমুখী এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী। নিজ হাতে গড়া বাড়ির উঠোনের পশ্চিম পাশে ২০২০ সালেই তিনি নিজের ও প্রিয়তমা স্ত্রীর শেষ ঠিকানা (কবর) প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। আজ সেই নিঝুম ও পবিত্র কবরেই তিনি শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন, আর তাঁর স্মৃতির পাহারা দিচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁরই রোপণ করা প্রিয় খেজুর ও সজিনা গাছটি।
শেষ বিদায়: প্রকৃতির নীরব অশ্রু ও রোদ-বৃষ্টির মিতালী:
গত ৬ মে সকাল ১০টায় বাবার হাত যখন আমার হাতের ভেতরে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল, তখন যেন পুরো পৃথিবীটা থমকে গিয়েছিল। বিদায়ের দিন দুপুর থেকে চলা অঝোর বৃষ্টি ছিল যেন প্রকৃতির নীরব অশ্রু। আর জানাজা শেষে যখন তাঁকে কবরে শায়িত করা হলো, তখনই মেঘ চিরে পশ্চিম আকাশে সূর্যের ঝিলিক দেখা দিল। রোদ-বৃষ্টির সেই অদ্ভুত মিশেল যেন জানান দিল—এক আলোকিত নক্ষত্রের সার্থক প্রস্থান ঘটল আজ।

অমরত্ব কেবলই কর্মে:
আজ বাড়ি ভরা শোকাতুর মানুষ, চারদিকে তাঁর ব্যবহৃত ডায়েরি ও চশমা—শুধু সেই গম্ভীর অথচ চিরচেনা কণ্ঠস্বরটি নেই। তিনি হয়তো শত বছর বাঁচেননি, কিন্তু তাঁর নীতিনিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখবে মানুষের হৃদয়ে। বাবা, আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। ওপারে ভালো থেকো আমাদের আশ্রয়, আমাদের সাহস।
بِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيراً> “হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, যেভাবে তাঁরা আমাকে
শৈশবে দয়া ও স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন।”
“বাবা শুধু আমাদের জন্মদাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের হিমালয়সম সাহস, শেষ আশ্রয় এবং আত্মমর্যাদার এক অবিনাশী প্রতিচ্ছবি। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে ধারণ করাই হবে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।”
Leave a Reply